বৈদ্যুতিন বর্জ্য-বিপদ ও সম্ভাবনা (ELECTRONIC WASTE)

আপনার হাতের স্মার্টফোনটি দিয়ে দিব্যি আপনার কাজ চলে যাচ্ছে। কিন্তু বাজারে বেরোনো নতুন নতুন ফীচার যুক্ত স্মার্টফোনের নতুন একটি মডেল দেখে আপনার ইচ্ছে জাগলো সেটি কেনার। কিনেও ফেললেন। কিন্তু আপনার পুরোনো স্মার্টফোনটি? সেটি বহুদিন ঘরে পড়ে থাকার পর একদিন ফেলে দিলেন আবর্জনায়। অর্থাৎ তা পরিণত হলো Electronic waste বা e-waste এ। তবে শুধুমাত্র স্মার্টফোন-ই নয়। তালিকায় রয়েছে পুরোনো টিভি,ফ্রিজ,ল্যাপটপ ছাড়াও যেকোনো ইলেক্ট্রনিক্স এর যন্ত্রাংশ।
Electronic waste বর্তমানে ভারত বনাম বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের কাছে অন্যতম ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম Electronic waste উৎপাদনকারী দেশ। সমীক্ষা অনুসারে,২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে 5.3 কোটি টন Electronic waste উৎপন্ন হয়েছিলো। আর সবথেকে বেশি Electronic waste উৎপন্ন হয় ইউরোপে। সময় যত এগোচ্ছে, নগরায়নের কারণে মানুষের মধ্যে চাহিদা বাড়ছে ইলেকট্রনিক জিনিস ব্যবহারের। আর বর্তমান সময়ে তৈরী বেশিরভাগ ইলেকট্রনিক জিনিসই খারাপ হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। ফলস্বরূপ ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে Electronic waste-এর পরিমাণ। Global E-waste Monitor 2020-র সমীক্ষা অনুসারে, বিশ্বজুড়ে কেবলমাত্র 17.4% Electronic waste রিসাইকেল অর্থাৎ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়েছে। আর যেই সমস্ত ওয়েস্ট গুলি রিসাইকেলেবেল নয়, অনেকক্ষেত্রে সেগুলিকে পুরাপুরিভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয় না। আর এই নন রিসাইকেলেবেল Electronic waste গুলিই বর্তমানে পরিবেশদূষণের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার একটু অন্যদিকটাও দেখা যাক।ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলি তৈরিতে তামা,প্ল্যাটিনাম,রূপো এমনকি সোনার মতো বহুমূল্য ধাতুগুলি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলির চাহিদা মেটাতে দিনের পর দিন খনি থেকে এইসকল বহুমূল্য ধাতুগুলি সংগ্রহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ,ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলি তৈরির পিছনে আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক এই বহুমূল্য ধাতুগুলি। আবার, Electronic waste গুলি ধ্বংস করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সেগুলিকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সমীক্ষা বলছে, ২০১৯ সালে পুড়িয়ে ফেলার কারণে ৫৭০০ কোটি টাকা মূল্যের সোনা বা রুপাজাতীয় বহুমূল্য ধাতু ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে বিশ্বকে এই সংকটের হাত থেকে মুক্ত করার উপায় কি? একদল গবেষকদের গবেষণা অনুযায়ী, Electronic waste এর উৎপাদন কমাতে হলে, ইলেকট্রনিক কোম্পানিগুলির উচিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস গুলিকে গ্রাহকের কাছে বিক্রি না করে, তা ভাড়ায় দেওয়া। অর্থাৎ ডিভাইস গুলির মালিক থাকবে নির্মাণকারী কোম্পানিগুলিই। কোনো যন্ত্রাংশ খারাপ হলে ডিভাইস গুলি ফেরত যাবে কোম্পানিগুলির কাছেই। এবং তারা খারাপ যন্ত্রাংশগুলি সারিয়ে তা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তুলবে। অপরদিকে, ডিভাইস গুলি কোম্পানির মালিকানায় থাকলে তাকে রিসাইকেল করার দায়ও বর্তাবে কোম্পানিগুলির ওপর। কারণ বেশিরভাগ গ্রাহকেরাই জানেন না যে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলি খারাপ হলে তা কিভাবে নিঃশেষ করা প্রয়োজন অর্থাৎ, Electronic waste গুলির সঙ্গে কি করা উচিত তা সাধারণ মানুষের জানা নেই। বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্মাতা কোম্পানিগুলি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা মেরামত করা যায় এমন ইলেকট্রনিক ডিভাইস বানায় না। কারণ তাদের কোনো দায় নেই সেগুলি রিসাইকেল করার। জানলে অবাক হবেন, বিশ্বের কতকগুলি বড়ো বড়ো প্রিন্টিং কোম্পানি ইতিমধ্যেই এই প্রক্রিয়ায় কাজ করা শুরু করে দিয়েছে। তারা বিভিন্ন অফিসে প্রিন্টিং মেশিনগুলিকে লিজে দেয় ও লিজের সময় শেষ হয়ে গেলে মেশিনগুলি নিয়ে নেয়। কোনো যন্ত্রাংশ খারাপ হলে তা সারিয়ে পুনরায় অন্য কোনো জায়গায় সেগুলি লিজে দিয়ে দেয়। আর যদি মেশিনগুলি ব্যবহারযোগ্য না থাকে তবে তার সচল যন্ত্রাংশগুলি খুলে নিয়ে অন্য কোনো মেশিনে তা ব্যবহার করা হয়।
তাহলে ভাবুন তো, আমাদের দেশও যদি এই পথে এগোয় ? অর্থাৎ,দেশীয় কোম্পানিগুলি যদি ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলিকে ভাড়ায় দেয় এবং আমরাও এই পদ্ধতিটিকে সমর্থন জানাই , তবে ইলেকট্রনিক waste এর পরিমান কতটা কমে যাবে ? বর্তমানে আমাদের উচিত, প্রতিবার নতুন নতুন ডিভাইস না কিনে,ঘরে পড়ে থাকা পুরোনো ডিভাইস গুলিকে সারিয়ে তা পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব হলে, সেই পথেই এগোনো। Electronic waste মুক্ত পরিবেশ তথা বিশ্ব গড়ে তুলতে হলে এভাবেই এগিয়ে আসতে হবে আমাদের ও আপনাদের।

Covid

Co